প্রকৃতিই ছোট্ট তানিয়ার মোবাইল  

তানিয়া পরিসান হয়ে উঠেছে তার মেয়ে টিউলিপ কে নিয়ে।সবে বয়স পাঁচ।কিন্তু মোবাইলটাই যেন সব কিছু।তানিয়া মেয়ে কে খাওয়াতে গেলেই টিউলিপ বলে -মা আগে মোবাইল দাও,তাহলে খাবো।তানিয়া বাধ্য হতো মোবাইল টা দিতে।কারণ ছোট্টো টিউলিপ সেই সকাল সাত টাই স্কুলে গিয়ে দুপুর 1 টাই বাড়ী ফিরেছে,সারা সকাল টা কিচ্ছু খাই নি।তাই তানিয়া রোজ দুপুরে খাওয়ার সময় মোবাইল টা দিয়ে দিত।একদিন তানিয়ার মনে হলো এইটুকু বয়সে এতো মোবাইল দেখাটা একদমই ঠিক হচ্ছে না।খুব বকাঝকা করলো ছোট্ট টিউলিপকে।টিউলিপ কিছুতেই শুনবে না।টিউলিপ হঠাৎ করে বলে উঠলো-আমাকে তাহলে একটা মোবাইল কিনে দাও,মোবাইল ছাড়া আমার ভালো লাগে না,মা।তানিয়া টিউলিপ এর কথা শুনে হতবাক।কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।

রাত্রে খাবার সময়ও টিউলিপ এর মোবাইল চাই।তানিয়া মোবাইল না দিয়ে টিভি চালিয়ে দিত মাঝে মাঝে।কিন্তু এইভাবে টিভি আর মোবাইল দিতে দিতে একদিন তানিয়া বুঝতে পারলো যে তানিয়া ঠিক করছে না,এত টিভি আর মোবাইল দিয়ে,এতে টিউলিপ এর খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

একদিন রাত্রে ঘুম পাড়ানোর সময়,তানিয়া ঠিক করলো টিউলিপ কে এমন একটা গল্প শোনাবে যাতে ও পরের দিন থেকে মোবাইল না দেখে।

তানিয়া : সোনা ,আজ তোমাকে পরীদের গল্প শোনাবো,দেখবে রাত্রে স্বপ্নে জাদু হবে।

টিউলিপ: মা ,কিসের গল্প,বলো।

তানিয়া: তাহলে বলি-

টিউলিপ : বলো।

তানিয়া: একটা পরী ছিল,কি সুন্দর সাদা রঙ্গের গাউন পরে ছিল,আর পিঠে ডানা ছিল ।পরীর একদম ই ঘরে থাকতে ভালো লাগছিলো না। তাই সে বেরিয়ে পড়লো মাঠে।খোলা মাঠ,মাঠের ওপরে ছোট্ট ছোট্ট সবুজ ঘাস,বিশাল বড় মাঠ,নীল আকাশ যেন মাঠের শেষে মিশে গেছে,সাদা সাদা তুলোর মতো মেঘ আকাশের গায়ে সরে সরে যাচ্ছে,মাঠের ডানদিকে আগাছাগুলোর মধ্যেও কত নীল সাদা ফুল ফুটে আছে,আর প্রজাপতিগুলো একবার নীল ফুলে আরেকবার সাদা ফুলে বসছে।পরী টা শুধু ভাবতে থাকে -ইস,আমি যদি ওই মেঘের পিঠে চেপে আকাশের সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে পারতাম,এইরকম ভাবতে ভাবতে হঠাৎ কখন আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল।পরী টা শুধু দেখছে দুটো কালো মেঘ কেমন করে ধাক্কা লেগে পৃথিবীর বুকে বৃষ্টি নামিয়ে সব কিছুকে শান্ত করে দেয়।হঠাৎ পরী নিজেও স্নিগ্ধতা অনুভব করলো,পরী দেখলো তার ডানাদুটো বৃষ্টির ছোঁয়ায় শীতল হয়ে গেছে।আর তাই পরী ডানাতে ঝাপটা মারলো,আর সেই দুটো ডানা থেকে বৃষ্টির ফোঁটা তার নিচে থাকা প্রজাপতির ডানায় পড়ল,আর তখন ই প্রজাপতিটাও আনন্দে ডানা ঝাপ্টালো,আর সেই বৃষ্টির ফোঁটা প্রজাপতির নিচে থাকা ফুলের পাপড়ি তে পড়লো, ফুল টা আরো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠলো।পরীর এইসব কিছু দেখতে খুব মজা লাগছিলো।পরীর এমন সময় তার মায়ের কথা মনে পড়লো আর মনে মনে তার মাকে বললো,মা তুমি ঠিক করেছো আমার কাছ থেকে মোবাইল টিভি ছিনিয়ে নিয়েছো।এইসব কিছু ভাবতে ভাবতে কখন যে বৃষ্টি থেমে আকাশে আবার সাদা মেঘের ভেলা বইতে শুরু করেছে,পরী তা টের পাই নি।পরী আনন্দে নাচতে নাচতে মায়ের কাছে যায় আর মা কে বলে-মা জানো তো আজ আমি জ্যান্ত টিভি দেখেছি।তুমি ঠিক বলতে মা,ঘরের টিভি টা বড্ডো ছোট্টো,মোবাইল টাও খুব ছোটো কিন্তু বাইরের এই বড়ো মোবাইল টা খুব খুব বড় মা।যখন আমি তোমার মোবাইলে ডোরেমন দেখি,ডোরেমন কে চুমু  দিলে, ও আমার দিকে ফিরেও তাকাই না মা,আর টিভি তে যে প্রজাপতিগুলো দেখি, তাদের কে ছুঁলে সাড়া দেয় না।কিন্তু আমার এই বিশাল বড়ো টিভি তে আমার ছোঁয়ায় প্রজাপতি ডানা ঝাপটেছে,প্রজাপতির ছোঁয়ায় ফুল পাপড়ি মেলেছে। মা,কিন্তু আজ বৃষ্টি টা কিভাবে থেমে গেল সেইটা দেখতে ভুলে গেছি,তোমার কথা ভাবছিলাম বলে।আর কখনও ঘরের টিভি দেখবো না মা।ভগবানের এই পৃথিবীটা বিশাল বড় টিভি।কত লোক,কত গাড়ী, কত রাস্তা।আবার কোথাও শুধুই খোলা মাঠ,মাঠের শেষে আকাশটা নিচে নেমে গেছে,আর পায়ের নিচে শুধুই সবুজ ঘাস,সকালবেলা ঘাসের মধ্যে শিশিরবিন্দু,আবার কখনো সারা আকাশ কালো মেঘে ঢাকা,এই বৃষ্টি এই রোদ। মা জানো,যখন এই বিশাল টিভি তে বৃষ্টি পড়ে,আমি ভিজে যাই কিন্তু ঘরের এই ছোট্ট টিভি তে যখন বৃষ্টি পড়ে,শুধু ডোরেমন ই ভিজে আমি ভিজি না।ঘরের টিভি টা বড্ডো বাজে।

টিউলিপ হটাৎ করে বলে ওঠে – মা,আমাদের ঘরের টিভি টাও তো বাজে,টিভি তে বৃষ্টি পড়লে আমিও ভিজি না মা। মা আমিও কাল থেকে বাইরের ওই বিশাল বড় টিভি টা দেখবো। কিন্তু মা ওই বিশাল মাঠে আমাকে কে নিয়ে যাবে ?

তানিয়া : তুমি জানালা দিয়ে দেখবে,ছাদে মাসির সাথে গিয়ে দেখবে তোমার জ্যান্ত টিভি।আর ছুটির দিনে আমি তোমাকে বিশাল বড় মাঠে নিয়ে যাবো।

টিউলিপ:ঠিক আছে মা,তুমিই ঠিক বলেছ মা।

তানিয়া মনে মনে ভাবে তাহলে আমার ছোটো টিউলিপ কাল থেকে প্রকৃতির দেওয়া বড় টিভি দেখবে তো ?? ঘরের ছোট্ট মোবাইল আর টিভি কে ত্যাগ করতে পারবে তো ??

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: